মুসলিম পরিবারের আতিথেয়তায় ইসলাম গ্রহণ

আমি একটি খ্রিস্টান ধার্মিক পরিবারে বেড়ে উঠেছি। আমাদের সব কিছুতেই ধর্ম জড়িয়ে ছিল। যুবক বয়সে আমি ধর্ম পালনে অত্যন্ত নিষ্ঠাবান ছিলাম এবং চার্চে শিশুদের শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত ছিলাম। ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ঘরে টেলিভিশন ছিল না। সময় কাটাতে হাতের কাছে যে বই পেতাম সেটাই পড়তাম। ধর্মীয় বইগুলোও বাদ যেত না।

সত্যের খোঁজে অবিরাম চেষ্টা : ১২ বছর বয়সে খ্রিস্টধর্মের ব্যাপারে আমার প্রচণ্ড সংশয় তৈরি হয়। ১৪ বছর বয়সে আমি সিদ্ধান্ত নিই যে, খ্রিস্ট মতবাদ সত্য নয়। তবে আমি খ্রিস্ট মতবাদের বিকল্পও কিছু খুঁজে পাচ্ছিলাম না।

তখন থেকে আমি নিজের বিশ্বাস ও চিন্তার আলোকে একটি ধর্মের কাঠামো কেমন হওয়া উচিত, তা দাঁড় করানোর চেষ্টা শুরু করলাম। কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি মানুষের জ্ঞাত হতে হবে, তার লেখ্য উপাদানগুলো সুসংহত হবে, প্রকৃতিগুলো সঠিক হবে, ধর্মের বিধানগুলো যৌক্তিক ও মানুষের সাধারণ প্রকৃতির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ হবে এবং সর্বোপরি তা অবশ্যই একত্ববাদে বিশ্বাসী হবে।

প্রাচীন ধর্মে সত্যের অনুসন্ধান : আমি ধরেই নিয়েছিলাম আমার তৈরি অবকাঠামো প্রাচীন ধর্মগুলোর মধ্যে পাওয়া যাবে। কিন্তু যেসব প্রাচীন ধর্ম নিয়ে আমি চিন্তা-গবেষণা করেছি তার সবগুলো বহুশ্বেরবাদী।

ভুল ধারণাবশত আমি ইসলাম নিয়ে কোনো অনুসন্ধান করিনি। কিছুদিন পর আমার ভেতর হতাশা তৈরি হয়। হয়তো আমি কাঙ্ক্ষিত সত্য খুঁজে পাব না। বিশেষত বৌদ্ধ ধর্মের ব্যাপারে কিছুটা আশাবাদী হয়ে ওঠার পর যখন জানতে পারলাম এটি আমার কাঙ্ক্ষিত সত্য নয়, তখন খুব বেশি হতাশ হলাম।

কোরআন তেলাওয়াত শুনে ফরাসি তরুণীর ইসলাম গ্রহণ

আমি দক্ষিণ ফ্রান্সের একটি ক্যাথলিক পরিবারে বেড়ে উঠেছি। ছুটি কাটানো ছাড়া ধর্ম আমাদের জীবনের বিশেষ কিছু ছিল না। ফ্রান্সে ধর্ম একটি ব্যক্তিগত বিষয়।

মাধ্যমিক স্কুলে একটি মুসলিম মেয়ে আমার সহপাঠী ছিল। তার সঙ্গে কেউ বন্ধুত্ব করতে রাজি ছিল না। আমি তাঁর দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিলাম।

আমার মা-বাবা বলেছিলেন সবার প্রতি সহানুভূতিশীল হতে—সে যে বর্ণেরই হোক এবং যেখান থেকেই আসুক। তাই আমি তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্বের সিদ্ধান্ত নিলাম।

মনে পড়ে, মারিয়াম ছিল ব্যক্তিত্ববান এবং অঙ্ক করার সময় সমস্যায় পড়লে সে আমাকে সাহায্য করত। সপ্তাহে দুইবার আমি ও মারিয়াম আমাদের বাড়িতে লেখাপড়া করতাম। একদিন কোনো কারণে আমাদের বাড়িতে পড়া সম্ভব ছিল না।

সে আমাকে তাদের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানাল। আমি আগে কখনো তাদের বাড়ি যাইনি। তার মায়ের সঙ্গে দেখা হবে—এই ভাবনায় আমার ভেতর উত্তেজনা অনুভব করছিলাম। তখন আমার বয়স ১৫ বছর।

তারা ছোট একটি অ্যাপার্টমেন্টে থাকত এবং মারিয়ামের নিজস্ব কোনো বেডরুম ছিল না। আমরা লিভিংরুমেই পড়তে বসলাম। তার মা ছিলেন খুবই বন্ধুসুলভ।

তিনি আমাদের জন্য খাবার তৈরি করলেন। আমরা যখন পড়ছিলাম, মারিয়ামের মা তখন রুমের অন্য পাশে বসে একটি বই পড়ছিলেন। যদিও তিনি নিচু স্বরে পড়ার চেষ্টা করছিলেন, তবু আমি তাঁর চমৎকার সুর শুনতে পাচ্ছিলাম।

মারিয়ামকে জিজ্ঞেস করলাম, তার মা কী করছেন। সে উত্তর দিল, মা মুসলমানের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআন পাঠ করছেন। আমি বিস্মিত হলাম। কেননা আমি কখনো এভাবে কাউকে বাইবেল পাঠ করতে দেখিনি।

মারিয়ামের মাকে বললাম, আপনি আমাদের কাছে বসুন এবং কোরআন পাঠ করে শোনান। যদিও আমি একটি শব্দও বুঝিনি, তবু তাঁর কোরআন পাঠে আনন্দ পেলাম এবং তা আমার হৃদয় ছুঁয়ে গেল।

সেদিনের পর আমি বারবার মারিয়ামের বাড়ি যাওয়ার চেষ্টা করেছি, যেন তার মায়ের কাছ থেকে কোরআন তিলাওয়াত শুনতে পারি। কোরআন শুনতে শুনতে একপর্যায়ে আমি তাঁর ধর্ম সম্পর্কে জানতে চাইলাম।

তিনি ইসলামের পাঁচটি মূলস্তম্ভ সম্পর্কে জানালেন। তিনি প্রতিদিন পাঁচবার স্রষ্টার প্রার্থনা করেন শুনে আমি বিস্মিত হলাম। আমি তাঁর প্রার্থনা (ইবাদত) দেখার আবেদন করলাম এবং তিনি তা অনুমোদন করলেন।

তাঁর প্রার্থনা, স্রষ্টার সামনে তাঁকে সিজদাবনত দেখে ইসলামের প্রতি আমার ভক্তি ও ভালোবাসা তৈরি হলো। একদিন আমি বললাম, আমি কি আপনার সঙ্গে প্রার্থনা করতে পারি? তিনি আমাকে মুসলিম হতে না বলে তাঁর সঙ্গে প্রার্থনা করার আহ্বান জানালেন।

আমি, মারিয়াম ও তার মা লিভিংরুমে একসঙ্গে প্রার্থনা করলাম। তখন আমার বয়স ১৬ বছর। ইসলাম গ্রহণের আগেই আমি ইসলামী প্রার্থনায় (নামাজ, মোনাজাত ইত্যাদি) অভ্যস্ত হয়ে গেলাম।

তবে আমি পরিবার নিয়ে চিন্তিত ছিলাম। আমার ভয় ছিল, তারা এটা অনুমোদন করবে না। মারিয়াম ও তার মা আমাকে কখনো ইসলাম গ্রহণের জন্য চাপ দেননি।

হাই স্কুল শেষ করার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য আমি প্যারিসে যাই। এটা ছিল আমার জীবন বদলে দেওয়ার অবারিত সুযোগ। আমি বিষয় হিসেবে ইতিহাস ও আরবি ভাষা নির্বাচন করলাম।

কারণ আমি কোরআন সম্পর্কে জানতে চাই। ইসলাম সম্পর্কে আমার আগ্রহ বাড়ছিল। ইসলাম সম্পর্কে পড়তে শুরু করলাম এবং প্রার্থনার অভ্যাস অব্যাহত থাকল। ইসলাম সম্পর্কে যত জানছিলাম, ইসলাম গ্রহণের আগ্রহ তত বাড়ছিল।

মারিয়ামের মায়ের প্রথম তিলাওয়াত শোনার ১০ বছর পর আমি ইসলাম গ্রহণ করি। পরিবারকে ইসলাম গ্রহণের কথা জানালে তারা ব্যথিত হয়। তাদের সঙ্গে সম্পর্ক বহাল রাখতে এবং তাদের ভুল ভাঙাতে আমার দীর্ঘ সময় লাগে।