মুসলমান খেলোয়াড়দের সমর্থনে চালু হচ্ছে মুসলিম অ্যাথলিট চার্টার

সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে ফ্রান্সের ফুটবলার পল পগবা যখন হেইনিকেইন ব্র্যান্ডের একটি বিয়ারের বোতল টেবিল থেকে সরিয়ে রাখেন, তখন সেটা নিয়ে বিস্তর আলোচনার সৃষ্টি হয়।অ্যালকোহল পান, কিংবা তার প্রসার ও বিজ্ঞাপনে অংশ নেয়া মুসলমানদের জন্য নিষিদ্ধ,

তাই একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান হিসেবে হয়তো তিনি এটা অনুভব করেছেন যে এর থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখা দরকার। কিন্তু এমন একটি পরিস্থিতিতে তাকে ঠেলে দেয়ার কতটা দরকার ছিল?

অলাভজনক সংস্থা নুজাম স্পোর্টসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী এবাদুর রহমান বলেন, ‘পল পগবার বোতল লুকিয়ে রাখার এই ঘটনা এটা বোঝাচ্ছে যে শিক্ষার প্রয়োজন রয়েছে।

’বিবিসি স্পোর্টের শামুন হাফেজ জানিয়েছেন, গত শনিবার আনুষ্ঠানিকভাবে একটি চার্টার বা সনদ প্রকাশ করা হয়েছে, যাকে বলা হচ্ছে ‘মুসলিম অ্যাথলিট চার্টার’। এটিকে ‘এ ধরণের প্রথম’ চার্টার বলে বর্ণনা করা হচ্ছে এবং এই ধারণা এসেছে এবাদুর রহমানের মাথা থেকে।

এবাদুর রহমান আগে ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এফএ) সাথে কাজ করতেন।মুসলমান পুরুষ ও নারী খেলোয়াড়দের সমর্থন করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠার যাতে এগিয়ে আসে, এই চার্টার সেটিই চাইছে। আর যারা এতে স্বাক্ষর করছে, তারা ‘ইতিবাচক পরিবর্তন’ নিয়ে আসার ব্যাপারে অঙ্গীকার করছে।

চার্টারে সব মিলিয়ে ১০টি পয়েন্ট বা দফা রয়েছে, যার মধ্যে অ্যালকোহল পরিহার- এমনকি উদযাপনের সময়েও, প্রার্থনার জন্য উপযোগী স্থানের ব্যবস্থা করা, হালাল খাবার এবং রমজান মাসে রোজা রাখার অনুমতি দেয়া।এবাদুর রহমান বিবিসি স্পোর্টকে বলেন, ‘আমি খেলাধুলার জগতে কাজ করার সুবাদে জানি যে এখানে আমার ধর্ম মেনে চলা কতটা কঠিন।’

‘খেলোয়াড় ও ক্লাবগুলোর সাথে কথা বলে আমরা এটা অনুভব করেছি যে যুক্তরাজ্যে একটি মুসলিম অ্যাথলিট চার্টার চালু করার এটাই সঠিক সময়। আমরা বিশ্বাস করি এটাই প্রথম এবং এর মতো কিছু আগে হয়নি।’‘সংহতি, সমতা এবং নিজেদের ক্লাব ও টিমে মুসলমান খেলোয়াড়রা যে অবদান রাখছে তাকে স্বীকৃতি দেয়ার যে ইতিবাচক আন্দোলন, তাতে যোগ দিতে শুরু করেছে ক্লাব ও সংগঠনগুলো।’

‘রোমাঞ্চকর’ চার্টারে প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবের সমর্থন
নুজাম হিসেব করে দেখেছে যে ইংল্যান্ডের চারটি প্রধান ফুটবল লিগের প্রথম টিম এবং অ্যাকাডেমিগুলোয় ২৫০ জনের মতো মুসলিম ফুটবলার আছে।এদের মধ্যে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের পল পগবা, লিভারপুলের সালাহ এবং মানে, চেলসির এন’গোলো কন্তে ও অ্যান্তোনিও রুডিগাররা বিশ্বব্যাপী বেশ পরিচিত।

এই চার্টার প্রকাশিত হওয়ার আগেই প্রিমিয়ার লিগের পাঁচটি এবং ইএফএলের ১৫টি ক্লাব ইতোমধ্যে একে সমর্থন জানানোর অঙ্গীকার করেছে।‘কিক ইট আউট’ এবং ফুটবল সাপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের মতো ক্যাম্পেইন গোষ্ঠীগুলো বলছে, তারা এই উদ্যোগের সাথে আছে।

ব্রেন্টফোর্ড ক্লাবের একজন মুখপাত্র বিবিসি স্পোর্টকে বলেছেন, ‘যুক্তরাজ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় গোষ্ঠী হলো মুসলমানেরা এবং এই সম্প্রদায় দ্রুত বাড়ছে। প্রিমিয়ার লিগেরই বিভিন্ন ক্লাবে ৭০ জনের মতো মুসলিম খেলোয়াড় খেলে থাকে।

ক্লাবগুলো যাতে বাড়িতে ও কাজের জায়গায় এসব খেলোয়াড়দের সমর্থন দেয়, সে ব্যাপারে তাদের সাহায্য দেয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই চার্টার এবং এর প্রতি যে সমর্থন দেয়া হচ্ছে, তার প্রয়োজন রয়েছে এবং ক্লাবগুলো একে স্বাগত জানাবে।’

ওয়াটফোর্ড একজন মুখপাত্র বলেন, নুজামের সাথে কাজ করতে পেরে তার ক্লাব ‘রোমাঞ্চিত’। তিনি আরো যোগ করেন, ‘আমরা মনে করি আমাদের প্রথম টিম, নারী টিম এবং অ্যাকাডেমির খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে এই চার্টার বড় উপকারে আসবে।’

গেমচেঞ্জার
একজন অ্যাথলিটের দৈনন্দিন এবং আধ্যাত্মিক বিভিন্ন প্রয়োজনে সহায়তা করে নুজাম। এছাড়া, ধর্ম সংক্রান্ত নানা প্রশ্নের উত্তর জানতে এবং সহায়তা পেতে ইসলামী পন্ডিতদের সাথেও যোগাযোগও করিয়ে দেয়।

এই সংগঠনটি ৯২টি ক্লাবের মুসলিম ফুটবলারদের জন্য উপহার পাঠিয়েছে। যারা এই উপহার পেয়েছেন, তাদের একজন এএফসি উইম্বলডনের মিড-ফিল্ডার ১৯-বছর বয়সী আইয়ুব আসাল, তিনি এই চার্টারকে ‘গেমচেঞ্জার’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

গত বছর ১৬ ম্যাচে চারটি গোল দিয়েছেন আসাল। বিবিসি স্পোর্টসকে তিনি বলেন, ‘মুসলমানদের জীবনযাপন কিছুটা ভিন্ন। দিনে পাঁচবার প্রার্থনা করার মতো কিছু দায়িত্ব পালন করতে হয়। আর মদ পান করার মতো কিছু বিষয় আছে, যা আপনি চাইলেও করতে পারেন না।’

তিনি আরো বলেন, ‘এই চার্টারটি মুসলিম ফুটবলারদের জন্য বেশ সাহায্যের হবে, কারণ এটি তাদের অধিকার নিশ্চিত করবে। তারা হালাল খাবার পাবেন, ক্যান্টিনে যাওয়ার ক্ষেত্রে দু’বার ভাবতে হবে না। ভাবতে হবে না কোনটা খাবো, কোনটা খাবো না – এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।’

‘ধর্ম আমাদের কাছে বেশ গুরুত্বপূর্ণ, এটা আমরা যে পৃথিবীতে বাস করি তার চেয়েও বড় ব্যাপার।’ওয়েস্ট হ্যামের নারী দলের মিডফিল্ডার হাওয়া সিসোকো বলেন, তার ক্লাবে তিনি পূর্ণ সমর্থন পেয়ে আসছেন, যেখানে সবাই তাকে ‘ভালোবাসে’।

কিন্তু তিনি মনে করেন, এই চার্টার তাকে ‘আরো সুখী ও শক্তিমান’ হিসেবে অনুভব করতে সাহায্য করবে।বিবিসি স্পোর্টকে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় এখন আমার সাথে একটা কমিউনিটি আছে যারা আমাকে সমর্থন দেবে, আমার আর একা লাগে না।’

‘নুজামের মাধ্যমে আমি খাদিজা মেল্লাহকে পেয়েছি, যিনি একজন জকি। এটা জেনে ভালো লাগে যে অনেক মুসলিম খেলোয়াড় আছে, যাদের সাথে আমরা আমাদের অভিজ্ঞতা বিনিময় করতে পারি। মানুষ কীভাবে থাকে, তারা কী ভাবে এগুলো জানতে পেরে ভালো লাগে।’

তিনি যোগ করেন, ‘একজন মুসলিম হিসেবে মানুষকে সঠিক বার্তাটা দেয়া প্রয়োজন। আমি এখানে সবাইকে প্রতিনিধিত্ব করি। যখন আমি চেঞ্জিংরুমে থাকি, তখন তারা কেবল আমাকে দেখে না – তারা দেখে সকল মুসলমানকে।’‘আমাকে সবসময় ভালো মেয়ে হয়ে থাকতে হবে, আমার পক্ষে যতটা ভালো হওয়া যায়।’সূত্র : বিবিস